মেগা রাউন্ডের ব্যর্থতার পর এবার ৪৯৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের দরপত্র আহ্বান করল বিপিডিবি
চলতি বছরের শুরু দিকে একটি বড় দরপত্রে হতাশাজনক সাড়া পাওয়ার পরে এবার ৪৯৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১০টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
গত ২৭ এপ্রিল এই নতুন দরপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৮ জুন। অর্থাৎ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রস্তাব তৈরির জন্য দুই মাস সময় পাবেন। দরপত্রের নথি বিক্রির শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ জুন।
দরপত্রের নথি অনুযায়ী, দেশের ১০টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে। প্রতিটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২৫ মেগাওয়াট থেকে ১০০ মেগাওয়াট। মূলত গ্রিডের স্থায়িত্ব বাড়ানো ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ টানতে ব্যর্থ হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে চারটি প্যাকেজে ওই দরপত্র ডাকা হয়। কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম—মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য প্রস্তাব জমা পড়েছিল।
খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের এই অনাগ্রহের মূল কারণ 'সভরেইন গ্যারান্টি' না থাকা। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রকল্পের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এই গ্যারান্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।
একই কারণে নতুন দরপত্র নিয়েও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, সেটি নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে।
তবে বিপিডিবি কর্মকর্তাদের দাবি, বিকল্প নিশ্চয়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে নির্বাচিত সৌর প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনবে বিপিডিবি।
সভরেইন গ্যারান্টি না থাকার ঝুঁকি
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আপত্তির মূল কারণ হলো সরকারের সভরেইন গ্যারান্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সাধারণত বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এই ধরনের আর্থিক নিশ্চয়তাকে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
টিবিএসের সঙ্গে আলাপকালে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন, অতীতের 'তিক্ত অভিজ্ঞতা' এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে বাধ্য হয়েছে বিপিডিবি। এতে সংস্থাটি বিপুল আর্থিক বোঝার মুখে পড়েছে।
রেজাউল করিম বলেন, "বিদ্যুৎ না পেয়েও টাকা দেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই আমরা এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য কোনো সভরেইন গ্যারান্টি দিচ্ছি না।' তবে এর বদলে ২০ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করবে বিপিডিবি। এর আওতায় উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০০ শতাংশই কিনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান আরও বলেন, 'আগামী ২০ বছর উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে পুরো বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করব। আমাদের যেহেতু ঘাটতি রয়েছে, তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরে কোনো ঊর্ধ্বসীমা চাপানো হবে না।' তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে—বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে এই নিশ্চয়তাই যথেষ্ট।
আগে উন্মুক্ত দরপত্র ও 'আনসলিসিটেড' প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ কিনত বিপিডিবি। তবে বিদ্যুতের অতিরিক্ত দাম নিয়ে উদ্বেগের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে।
নতুন দরপত্রে 'ওয়ান-স্টেজ, টু-এনভেলপ' পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। আগ্রহী পক্ষগুলোর বিভিন্ন কারিগরি প্রশ্নের উত্তর দিতে আগামী ১৮ মে বিদ্যুৎ ভবনে একটি প্রাক-দরপত্র বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দরদাতাদের প্রতি প্যাকেজের জন্য ২৫ হাজার মূল্যের দরপত্র নথি কিনতে হবে। পাশাপাশি প্রতি মেগাওয়াটের জন্য ৫ হাজার ডলারের 'টেন্ডার সিকিউরিটি' বা জামানত জমা দিতে হবে। মূলত প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই শর্ত রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলে একটি ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যা একটি নির্মাণাধীন ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এটিই হতে চলেছে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র।
কক্সবাজারে ৫০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে—একটি উত্তরে, অপরটি দক্ষিণে। এছাড়া পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও নেত্রকোনায় আরও তিনটি ৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সবগুলো কেন্দ্রকেই নিকটস্থ সাবস্টেশনের সাথে যুক্ত করা হবে।
পাশাপাশি ময়মনসিংহের ভালুকা ও কুড়িগ্রামে দুটি ৪৫ মেগাওয়াটের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় একটি ৩০ মেগাওয়াট ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে একটি ২৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
বিপিডিবি জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে এবং সঞ্চালন-সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে বিদ্যমান বা নির্মাণাধীন গ্রিড সাবস্টেশনের কাছাকাছি এলাকাগুলোকে কৌশলগতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বোর্ড আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন তাদের নিজস্ব রাজস্ব বাজেট থেকে করা হবে। এই প্রকল্পগুলোতে নিজেদের রাজস্ব বাজেট থেকেই অর্থ সংস্থান ক্রয়া হবে বলেও নিশ্চিত করেছে বিপিডিবি। অর্থাৎ তারা যে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পথেই হাঁটতে চাইছে, তা এই পদক্ষেপ থেকেই স্পষ্ট।
কৌশলগত বন্টন ও গ্রিডের স্থায়িত্ব
খাত-সংশ্লিষ্টরা এই দরপত্রকে আঞ্চলিক গ্রিড স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে বিপিডিবির একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। উত্তরের পঞ্চগড় থেকে শুরু করে দক্ষিণের কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে সংস্থাটি মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কমাতে চায়।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সহজ করতে বিশেষ করে বিদ্যমান বা নির্মাণাধীন সাবস্টেশনগুলোর কাছেই এই স্থানগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি বহুমুখীকরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সতর্ক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন অঞ্চলকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে এই প্রকল্পগুলো একদিকে যেমন আঞ্চলিক গ্রিডের স্থায়িত্ব বাড়াবে, তেমনি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়ক হবে।
নীতিনির্ধারক ও খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দরপত্রের সাফল্য মূলত বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে সভরেইন গ্যারান্টি না থাকার বিষয়টি এখনও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
বিদ্যুতের ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগকারীদের টানতে বিপিডিবি কতটা সফল হয়, অনেকটা তার ওপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের জ্বালানি ক্ষেত্রের রূপান্তরের গতিপ্রকৃতি।
